Summary
ব্যাকরণের সংজ্ঞা ও ইতিহাস:
ভাষাবিজ্ঞানে ব্যাকরণ বলতে ভাষার কাঠামোর, বিশেষ করে শব্দ ও বাক্যের কাঠামোর গবেষণাকে বোঝায়। এটি ভাষার রূপমূলতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্বের আলোচনা। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে, ব্যাকরণ একাধিক বিধি ও নিয়মের বর্ণনা, যার মধ্যে ধ্বনিতত্ত্ব ও প্রয়োগতত্ত্ব অন্তর্ভুক্ত হয়।
ব্যাকরণের দুটি প্রকার রয়েছে:
- বর্ণনামূলক ব্যাকরণ: উচ্চতর ভাষাবিজ্ঞানী মহলে প্রচলিত, যেখানে ভাষার বৈজ্ঞানিক বর্ণনা করা হয়।
- বিধানবাদী ব্যাকরণ: স্কুল কলেজে ব্যবহৃত, যেখানে আদর্শ ভাষার কিছু নিয়ম বিধিবদ্ধ থাকে।
ব্যাকরণ শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থ "বিশ্লেষণ"। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ভাষার বিশ্লেষণ করা এবং তার প্রয়োগের নীতি বোঝানোর শাস্ত্রকেই ব্যাকরণ বলা হয়।
বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ ১৭৪৩ সালে পর্তুগিজ ভাষায় প্রকাশিত হয়, লেখক মানোয়েল দা আসুম্পসাঁও। এরপর ১৭৭৮ সালে ইংরেজি ভাষায় সম্পূর্ণ বাংলা ব্যাকরণ প্রকাশিত হয়, লেখক নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড।
ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ব্যাকরণ বলতে সাধারণত ভাষার কাঠামোর, বিশেষ করে শব্দ ও বাক্যের কাঠামোর, গবেষণাকে বোঝায়। এ অর্থে ব্যাকরণ হল কোন ভাষার রূপমূলতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্বের আলোচনা। কখনও কখনও আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে ব্যাকরণ পরিভাষাটি দিয়ে কোন ভাষার কাঠামোর সমস্ত নিয়মকানুনের বর্ণনাকে বোঝানো হয়, এবং এই ব্যাপকতর সংজ্ঞার ভেতরে ঐ ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব ও প্রয়োগতত্ত্বের আলোচনাও চলে আসে।
উপরে দেওয়া ব্যাকরণের সংজ্ঞাগুলি মূলত উচ্চতর ভাষাবিজ্ঞানী মহলে প্রচলিত এবং এ ধরনের ব্যাকরণকে বর্ণনামূলক ব্যাকরণও বলা হয়। অন্যদিকে স্কুল কলেজে পাঠ্য ব্যাকরণগুলিতে ভাষার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক বর্ণনা থাকে না, বরং এগুলিতে সাধারণত মান ভাষার কাঠামোর কিছু বিবরণের পাশাপাশি আদর্শ বা মান ভাষাতে লেখার বিভিন্ন উপদেশমূলক নিয়ম বিধিবদ্ধ করে দেওয়া থাকে। এগুলিকে বলা হয় বিধানবাদী ব্যাকরণ।
ব্যুৎপত্তি ও সংজ্ঞা
ব্যাকরণ শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থ হলো "বিশ্লেষণ" (বি + আ + ক্রি + অন) বিশেষ এবং সম্যকরূপে বিশ্লেষণ। ভাষার সংজ্ঞা প্রসঙ্গে নানান সাহিত্যিক নানান মতামত লক্ষ্য করা যায় তবে যে সমস্ত মতামতগুলি গ্রহণযোগ্য তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এর মতে, যে শাস্ত্রে কোনো ভাষাকে বিশ্লেষণ করে তার স্বরূপ আকৃতি ও প্রয়োগের নীতি বুঝিয়ে দেওয়া হয়, সেই শাস্ত্র কে বলে সেই ভাষার ব্যাকরণ।
ইতিহাস
প্রথম বাংলা ব্যাকরণ প্রকাশিত হয় ১৭৪৩ সালে পর্তুগিজ ভাষায়। এর লেখক ছিলেন মানোয়েল দা আসুম্পসাঁও। তাঁর বাংলা-পর্তুগিজ অভিধানের ভূমিকা অংশ হিসেবে তিনি এটি রচনা করেন। এরপর ১৭৭৮ সালে প্রকাশিত হয় নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড প্রণীত ইংরেজি ভাষায় রচিত পূর্ণাঙ্গ একটি বাংলা ব্যাকরণ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ভাষার সংজ্ঞা ঃ
মানুষ তার মনের ভাব অন্যের কাছে প্রকাশ করার জন্য কণ্ঠধ্বনি এবং হাত, পা, চোখ ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাহায্যে ইঙ্গিত করে থাকে। কণ্ঠধ্বনির সাহায্যে মানুষ যত বেশি পরিমাণ মনোভাব প্রকাশ করতে পারে, ইঙ্গিতের সাহায্যে ততটা পারে না। আর কণ্ঠধ্বনির সহায়তায় মানুষ মনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবও প্রকাশ করতে সমর্থ হয়। কণ্ঠধ্বনি বলতে মুখগহ্বর, কণ্ঠ, নাক ইত্যাদির সাহায্যে উচ্চারিত বোধগম্য ধ্বনি বা ধ্বনি সমষ্টিকে বোঝায়। এই ধ্বনিই ভাষার মূল উপাদান। এই ধ্বনির সাহায্যে ভাষার সৃষ্টি হয়। আবার ধ্বনির সৃষ্টি হয় বাগ্যন্ত্রের দ্বারা। গলনালি, মুখবিবর, কণ্ঠ, জিহ্বা, তালু, দাঁত, নাক ইত্যাদি বাক্ প্রত্যঙ্গকে এক কথায় বলে বাগ্যন্ত্র। এই বাগযন্ত্রের দ্বারা উচ্চারিত অর্থবোধক ধ্বনির সাহায্যে মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যমকে ভাষা বলে।
বাংলা ভাষাঃ
বাংলা ভাষা (বাঙলা, বাঙ্গলা, তথা বাঙ্গালা নামেও পরিচিত) একটি ইন্দো-আর্য ভাষা, যা দক্ষিণ এশিয়ার বাঙালি জাতির প্রধান কথ্য ও লেখ্য ভাষা। মাতৃভাষীর সংখ্যায় বাংলা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের পঞ্চম ও মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুসারে বাংলা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা।বাংলা সার্বভৌম ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা তথা সরকারি ভাষা২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ভারতের মোট জনসংখ্যার ৮.০৩ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে।এছাড়াও মধ্য প্রাচ্য, আমেরিকা ও ইউরোপে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাংলাভাষী অভিবাসী রয়েছে।সারা বিশ্বে সব মিলিয়ে ২৭.৬ কোটির অধিক লোক দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ব্যবহার করে। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত এবং ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ও স্তোত্র বাংলাতে রচিত।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ভাষার ইতিহাস-
মানুষের কণ্ঠনিঃসৃত বাক্ সংকেতের সংগঠনকে ভাষা বলা হয়। অর্থাৎ বাগযন্ত্রের দ্বারা সৃষ্ট অর্থবোধক ধ্বনির সংকেতের সাহায্যে মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যমই হলো ভাষা।
দেশ, কাল ও পরিবেশভেদে ভাষার পার্থক্য ও পরিবর্তন ঘটে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থান করে মানুষ আপন মনোভাব প্রকাশের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বস্তু ও ভাবের জন্য বিভিন্ন ধ্বনির সাহায্যে শব্দের সৃষ্টি করেছে। সেসব শব্দ মূলত নিৰ্দিষ্ট পরিবেশে মানুষের বস্তু ও ভাবের প্রতীক (Symbol) মাত্র। এ জন্যই আমরা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষার ব্যবহার দেখতে পাই। সে ভাষাও আবার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে উচ্চারিত হয়ে এসেছে। ফলে, এ শতকে মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনে যে ভাষা ব্যবহার করে, হাজার বছর আগেকার মানুষের ভাষা ঠিক এমনটি ছিল না ।
বর্তমানে পৃথিবীতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি ভাষা প্রচলিত আছে। তার মধ্যে বাংলা একটি ভাষা। ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহৎ মাতৃভাষা। বাংলাদেশের অধিবাসীদের মাতৃভাষা বাংলা বাংলাদেশের ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের জনসাধারণ এবং ত্রিপুরা, বিহার, উড়িষ্যা ও আসামের কয়েকটি অঞ্চলের মানুষের ভাষা বাংলা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অনেক দেশে বাংলা ভাষাভাষী জনগণ রয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ত্রিশ কোটি লোকের মুখের ভাষা বাংলা ৷
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বাংলা ভাষার ইতিহাস -
বাংলা ভাষা বিকাশের ইতিহাস ১৩০০ বছর পুরনো। চর্যাপদ এ ভাষার আদি নিদর্শন। অষ্টম শতক থেকে বাংলায় রচিত সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারের মধ্য দিয়ে অষ্টাদশ শতকের শেষে এসে বাংলা ভাষা তার বর্তমান রূপ পরিগ্রহণ করে। বাংলা ভাষার লিপি হল বাংলা লিপি। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত বাংলা ভাষার মধ্যে শব্দগত ও উচ্চারণগত সামান্য পার্থক্য রয়েছে। বাংলার নবজাগরণে ও বাংলার সাংস্কৃতিক বিবিধতাকে এক সূত্রে গ্রন্থনে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে তথা বাংলাদেশ গঠনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব বাংলায় সংগঠিত বাংলা ভাষা আন্দোলন এই ভাষার সাথে বাঙালি অস্তিত্বের যোগসূত্র স্থাপন করেছে। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদী ছাত্র ও আন্দোলনকারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষাকরণের দাবিতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন। ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইন বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রীয় কাজে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।[১৮] ১৯৫২ সালের ভাষা শহিদদের সংগ্রামের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সাধু ভাষা প্রাচীনকাল থেকেই সাহিত্যের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের শুরু থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। সাধু ভাষা ছিল সাহিত্যিক ও চাষা। প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যিক নিদর্শনে সাধুভাষার প্রভাব দিল স্পষ্ট। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষা'র প্রচলন শুরু হতে থাকে। তৎকালীন সময়ের কিছু দোলেখক পণ্ডিতি সাহিত্যের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে আগামর জনসাধারণের 'কথ্য ভাষা'য় সাহিত্য রচনায় ব্রতী হন এবং সফল হন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন প্রমথ চৌধুরী। তিনিই প্রথম চলিত ভাষায় সাহিত্য রচনা শুরু করেন এবং 'সবুজপত্র' (১৯১৪) সাহিত্য পত্রিকার মাধ্যমে চলিত রীতিকে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করেন।



বাংলা ভাষার মৌলিক রূপ / রীতি দুইটি । যথা: কথ্য ভাষা রীতি ও লেখ্য ভাষা রীতি।
কথ্য ভাষা রীতি:
কথ্য ভাষা রীতি ভাষার মূল রূপ। কথ্য ভাষা রীতির উপরে ভিত্তি করে লেখ্য ভাষা রীতির রূপ তৈরি হয়। স্থান ও কালভেদে ভাষার যে পরিবর্তন ঘটে তা মূলত কথ্য ভাষা রীতির পরিবর্তন। তাই কথ্য ভাষা রীতির পরিবর্তনের ফলে নতুন নতুন ভাষা ও উপভাষার জন্ম হয়।
আঞ্চলিক কথ্য রীতি:
কথ্য রীতির আঞ্চলিক ভেদ সহজে বোঝা যায়। এই আঞ্চলিক ভেদ সাধারণত অঞ্চলের নামে পরিচিতি পায়। যেমন নোয়াখালীর ভাষা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভাষা, কিংবা সুন্দরবন অঞ্চলের ভাষা। ভাষার এই আঞ্চলিকতা উপভাষা নামে আখ্যায়িত হয়ে থাকে। বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে আঞ্চলিক ভাষা বলে। আঞ্চলিক ভাষার অপর নাম উপভাষা। আক্ষরিক অর্থে উপভাষা বলতে 'ভাষা'র চেয়ে একটু নিম্ন বা কিছুটা কম মর্যাদাসম্পন্ন ভাষাকে বোঝায়। পৃথিবীর সব ভাষারই উপভাষা আছে। সাধারণত ভৌগোলিক এলাকাভেদে বাংলা ভাষার নানা বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। ভাষার এ আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে বলা হয় উপভাষা।
প্রমিত চলিত ভাষারীতি:
দেশের সকল মানুষ যে আদর্শ ভাষারীতিতে কথা বলে, যেই ভাষারীতি সকলে বোঝে, এবং যে ভাষায় সকলে শিল্প-সাহিত্য রচনা ও শিক্ষা ও অন্যান্য কাজকর্ম সম্পাদন করে, সেটিই প্রমিত চলিত ভাষারীতি। এই ভাষায় যেমন সাহিত্য সাধনা বা লেখালেখি করা যায়, তেমনি কথা বলার জন্যও এই ভাষা ব্যবহার করা হয়। সকলে বোঝে বলে বিশেষ ক্ষেত্রগুলোতে, যেমন কোনো অনুষ্ঠানে বা অপরিচিত জায়গায় বা আনুষ্ঠানিক (formal) আলাপ-আলোচনার ক্ষেত্রে এই ভাষারীতি ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, এই রীতি লেখ্য ও কথ্য উভয় রীতিতেই ব্যবহৃত হয়।
বাংলা প্রমিত চলিত ভাষারীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ভাগীরথী- তীরবর্তী অঞ্চলের কথ্য ভাষার উপর ভিত্তি করে। তবে, পূর্বে এই ভাষা সাহিত্যের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত ছিল না। তখন কেবল সাধু ভাষাতেই সাহিত্য রচনা করা হতো। এ কারণে বাংলা সাহিত্যের প্রথম দিকের ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও ছোটগল্পকাররা সাধু ভাষায় উপন্যাস, নাটক ও গল্প লিখেছেন। পরবর্তীতে, প্রমথ চৌধুরী চলিত রীতিতে সাহিত্য রচনার উপর ব্যাপক জোর দেন এবং তাঁর ‘সবুজপত্র’ (১৯১৪) পত্রিকার মাধ্যমে চলিত রীতিতে সাহিত্য রচনাকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
সাধু রীতি:
পূর্বে সাহিত্য রচনা ও লেখালেখির জন্য তৎসম শব্দবহুল, দীর্ঘ সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ সম্পন্ন যে গুরুগম্ভীর ভাষারীতি ব্যবহৃত হতো, তাকেই সাধু ভাষা বলে। এই ভাষা অত্যন্ত গুরুগম্ভীর, দুরূহ এবং এতে দীর্ঘ পদ ব্যবহৃত হয় বলে এই ভাষা কথা বলার জন্য খুব একটা সুবিধাজনক না। তাই এই ভাষায় কথাও বলা হয় না। এই ভাষা কেবল লেখ্য রীতিতে ব্যবহারযোগ্য। তাও বহু আগেই লেখ্য রীতি হিসেবে চলিত রীতি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ায় সাধু রীতি এখন লেখ্য ভাষা হিসেবেও ব্যবহৃত হয় না। কেবল সরকারি দলিল-দস্তাবেজ লেখা ও অন্যান্য কিছু দাপ্তরিক কাজে এখনো এই রীতি ব্যবহৃত হয়।
আঞ্চলিক কথ্য রীতি:
কথ্য রীতির আঞ্চলিক ভেদ সহজে বোঝা যায়। এই আঞ্চলিক ভেদ সাধারণত অঞ্চলের নামে পরিচিতি পায়। যেমন নোয়াখালীর ভাষা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভাষা, কিংবা সুন্দরবন অঞ্চলের ভাষা। ভাষার এই আঞ্চলিকতা উপভাষা নামে আখ্যায়িত হয়ে থাকে। বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে আঞ্চলিক ভাষা বলে। আঞ্চলিক ভাষার অপর নাম উপভাষা। আক্ষরিক অর্থে উপভাষা বলতে 'ভাষা'র চেয়ে একটু নিম্ন বা কিছুটা কম মর্যাদাসম্পন্ন ভাষাকে বোঝায়। পৃথিবীর সব ভাষারই উপভাষা আছে। সাধারণত ভৌগোলিক এলাকাভেদে বাংলা ভাষার নানা বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। ভাষার এ আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে বলা হয় উপভাষা।
সাধু ও চলিত রীতি পার্থক্য
সাধু রীতি | চলিত রীতি / প্রমিত রীতি |
| সাধু রীতি ব্যাকরণের নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে এবং এর পদবিন্যাস সুনিয়ন্ত্রিত। | চলিত রীতি পরিবর্তনশীল। |
| এ রীতি গুরুগম্ভীর ও তৎসম শব্দবহুল। | এ রীতি তদ্ভব শব্দবহুল। |
| সাধু রীতি নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতায় অনুপযোগী। | এ রীতি নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতায় উপযোগী |
| এ রীতিতে সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ এক বিশেষ গঠন পদ্ধতি মেনে চলে। | এ রীতিতে সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ পরিবর্তিত ও সহজতর রূপ লাভ করে |
| সর্বনাম, ক্রিয়া ও অনুসর্গের পূর্ণরূপ ব্যবহার করা হয়। | সর্বনাম, ক্রিয়া ও অনুসর্গের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করা হয়। |
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সর্বনাম
ক্রিয়া
সম্বোধন পদ
অব্যয়
ব্যাকরণ-
ব্যাকরণ (= বি + আ + √কৃ + অন) শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থ বিশেষভাবে বিশ্লেষণ। সংজ্ঞা : যে শাস্ত্রে কোনো ভাষার বিভিন্ন উপাদানের প্রকৃতি ও স্বরূপের বিচার-বিশ্লেষণ করা হয় এবং বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক নির্ণয় ও প্রয়োগবিধি বিশদভাবে আলোচিত হয়, তাকে ব্যাকরণ বলে। ব্যাকরণ পাঠের প্রয়োজনীয়তা: ব্যাকরণ পাঠ করে ভাষার বিভিন্ন উপাদানের গঠন প্রকৃতি ও সেসবের সুষ্ঠু ব্যবহারবিধি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায় এবং লেখায় ও কথায় ভাষা প্রয়োগের সময় শুদ্ধাশুদ্ধি নির্ধারণ সহজ হয় বাংলা ব্যাকরণ : যে শাস্ত্রে বাংলা ভাষার বিভিন্ন উপাদানের গঠনপ্রকৃতি ও স্বরূপ বিশ্লেষিত হয় এবং এদের সম্পর্ক ও সুষ্ঠু প্রয়োগবিধি আলোচিত হয়, তাই বাংলা ব্যাকরণ । বাংলা ব্যাকরণে আলোচ্য বিষয প্রত্যেক ভাষারই চারটি মৌলিক অংশ থাকে। যেমন—
১. ধ্বনি (Sound)
২. শব্দ (Word )
৩. বাক্য (Sentence )
৪. অর্থ (Meaning)
সব ভাষার ব্যাকরণেই প্রধানত নিম্নলিখিত চারটি বিষয়ের আলোচনা করা হয়
১. ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology)
২. শব্দতত্ত্ব বা রূপতত্ত্ব ((Morphology)
৩. বাক্যতত্ত্ব বা পদক্রম (Syntax) এবং
৪. অর্থতত্ত্ব (Semantics)
এ ছাড়া অভিধানতত্ত্ব (Lexicography) ছন্দ ও অলংকার প্রভৃতিও ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয় ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
রাজা রামমোহন
ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
উইলিয়াম কেরি
সুনীতি কুমার চট্টপাধ্যায়
অভিধান:
ইংরেজি Dictionary এর বাংলা অর্থ অভিধান। অভিধান এর শাব্দিক অর্থ শব্দকোষ। যে গ্রন্থে কোনো ভাষার শব্দের বর্ণানুক্রমিক অবস্থান, বানান, উচ্চারণ, অর্থ, ব্যুৎপত্তি ও ব্যবহার নির্দেশ করা হয় তাকে অভিধান বলে।
- শব্দ সংকলন বা সংকলিত শব্দের গ্রন্থকে গ্রিক ভাষায় বলা হয় 'লেক্সিকন' (Lexicon)। ল্যাটিন ভাষায় রোমানরা বলতো 'ডিকশনারি' (Dictionary)। ল্যাটিন ভাষার ডিকশনারি থেকে ইংরেজি ভাষায় Dictionary শব্দটি গৃহীত হয়েছে এবং বাংলা ভাষায় এর পরিভাষা হিসেবে 'অভিধান' শব্দটির প্রচলন ঘটেছে।
- বাংলা ভাষার প্রথম অভিধান পর্তুগিজ ভাষায় রচনার প্রচেষ্টা চালান খ্রিষ্টান মিশনারি মনোএল দ্য আসুম্পসাঁউ। তার রচিত 'Vocabulario Em Idioma Bengalla, E Portuguez. Dividido Em Duas Partes' গ্রন্থটি রোমান হরফে পর্তুগিজ ভাষায় ১৭৪৩ সালে লিসবন থেকে প্রকাশিত হয়। ১৮১৭ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলা ভাষায় (বাংলা থেকে বাংলা) 'বঙ্গভাষাভিধান' নামে প্রথম অভিধান সংকলন করেন রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ। ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি এটি অখণ্ড পূর্ণাঙ্গ সংস্করণে 'বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান' নামে প্রকাশ করেন। বাংলা ভাষায় প্রথম 'থিসরাস' বা সমার্থক শব্দের 'যথাশব্দ' নামে ১৯৭৪ সালে প্রথম অভিধান সংকলন করেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান।
বর্ণানুক্রম:
অভিধানে একটির পর আরেকটি শব্দ সাজানো থাকে সংশ্লিষ্ট ভাষার বর্ণানুক্রমে। বাংলা ভাষায় 'অ' দিয়ে শুরু হয়ে ক্রমান্বয়ে অপর বর্ণগুলো ধারাবাহিকভাবে সাজানো থাকে।
নিচে বর্ণানুক্রমের আলোচনা করা হলো-
সাধারণ বর্ণানুক্রম:
অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ
ক, খ, গ, ঘ, ঙ, চ, ছ, জ, ঝ, ঞ
ট, ঠ, ড, ঢ, ণ, ত, থ, দ, ধ, ন
প, ফ, ব, ভ, ম, য, র, ল, শ, ষ
স, হ, ড়, ঢ়, য়, ৎ, ং, ঃ, ঁ
অভিধানে ব্যবহৃত বর্ণানুক্রম:
অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ , ং, ঃ, ঁ
ক, খ, গ, ঘ, ঙ, চ, ছ, জ, ঝ, ঞ
ট, ঠ, ড, ঢ, ণ, ত, থ, দ, ধ, ন
প, ফ, ব, ভ, ম, য, র, ল, শ, ষ স, হ
যুক্তাক্ষরের বর্ণানুক্রম:
ক, ক্ট, ক্ত, ক্ষ, ক্স, গ্ণ, গ্ধ, ঙ্ক, ঙ্ক্ষ,ঙ্খ, ঙ্গ ,ঙ্ঘ, ঙ্ম,
চ্চ, চ্ছ, চঞ, জ্জ, জ্ঝ, জ্ঞ, ঞ্চ, ঞ্জ, ঞ্ঝ, ট্ট, ড্ড, ড্গ,
ন্ট, ণ্ট, ণ্ড, ণ্ঢ, ণ্ণ, ণ্ম, ত্ত, ত্থ, দ্গ, দ্ঘ, দ্দ, দ্ধ, দ্ব,
দ্ভ, ধ্ব, ন্ট, ণ্ঠ, ন্ড, ন্ঢ, ন্ত, ন্থ, ন্দ, ন্ধ, ন্ন, ন্ম, প্ট,
প্ত, প্প, প্স, ব্জ, ব্দ, ব্ধ, ব্ব, ব্ভ, ম্প, ম্ব, ম্ভ, ম্ম,
ল্ক, ল্ট, ল্ড, ল্প, ল্ম, ল্ল, শ্চ, শ্ছ, ষ্ক, ষ্ট, ষ্ঠ, ষ্ণ, ষ্প,
ষ্ম, স্ক, স্ট, স্ত, স্থ, স্প, স্ফ, হ্ণ, হ্ন , হ্ম
কার চিহ্ন:
া, ি, ী, ু, ূ, ৃ, ে, ৈ, ো, ৌ
ং, ঃ, ঁ স্বরবর্ণের পরে এবং ব্যঞ্জনবর্ণের আগে ব্যবহৃত হয়।
শীর্ষ শব্দ:
অভিধানে যে শব্দের অর্থ দেয়া হয়, সেটি বোল্ড টাইপে বা মোটা হরফে মুদ্রিত থাকে। এটিকে বলে শীর্ষ শব্দ। যেমন:
অঋণী [অরিনি] বিণ ঋণমুক্ত; ঋণশূন্য। {স. অ+ঋণ+ইন (ইনি); স. অন্ণী}
-এখানে 'অঋণী' শব্দটি হচ্ছে শীর্ষ পদ।
ভুক্তি:
অভিধানে শীর্ষ শব্দের অর্থ, ব্যাখ্যা ও ব্যবহার যেভাবে বিধৃত থাকে, তাকে বলা হয় ভুক্তি। যেমন:

অভিধান
অভিধান | সম্পাদক |
| Vocabulario Em Idioma Bengalla, E Portuguez (১৭৪৩) | মনোএল দ্য আসসুম্পসাওঁ |
| বাংলা ভাষার অভিধান (১৮১৫) | উইলিয়াম কেরী |
| বাংলা ভাষার অভিধান (১৮১৫) | উইলিয়াম কেরী |
| বঙ্গভাষাভিধান (১৮১৭) | রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ |
| শব্দমঞ্জরী (বাংলা অভিধান) | ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর |
| বঙ্গীয় শব্দকোষ | হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় |
| নূতন বাঙ্গালা অভিধান (১৯১১) | হরিচরণ দে |
| চলন্তিকা (১৯৩০) | রাজশেখর বসু |
| যথাশব্দ (১৯৭৪) | মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান |
| লালন শব্দকোষ | রবিশঙ্কর মৈত্রী |
| শব্দদীধিতি অভিধান | শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় |
| সংসদ সমার্থশব্দকোষ (১৯৮৭) | অশোক মুখোপাধ্যায় |
| সংসদ বাঙ্গালা অভিধান | শৈলেন্দ্র বিশ্বাস |
| লৌকিক শব্দকোষ | কামিনীকুমার রায় |
| ব্যবহারিক শব্দকোষ | কাজী আবদুল ওদুদ |
| বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান | ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ |
| বাংলা একাডেমী সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান | আহমদ শরীফ |
| বাংলা একাডেমী ইংরেজি-বাংলা অভিধান | জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী |
| বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান | জামিল চৌধুরী |
| প্রমিত বাংলা বানান অভিধান | জামিল চৌধুরী |
| সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান | আবু ইসহাক |
| বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান | ড. এনামুল হক |
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
Read more